শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

চিনির বাজারে নৈরাজ্য

ক্রমবর্ধমান চিনির মূল্য নিয়ন্ত্রণে পণ্যটির আমদানি শুল্ক হ্রাস করা হলেও সার্বিক পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি।  জানা গেছে, সম্প্রতি আমদানি শুল্ক প্রতি কেজি চিনিতে à§§à§§ টাকা কমিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আশা করা হয়েছিল যে, এর ফলে দেশের বাজারে চিনির সরবরাহ বাড়বে এবং পণ্যটির দাম কমে আসবে। কিন্তু উল্টো পণ্যটির দাম কেজিতে পাঁচ টাকার মতো বেড়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, খুচরা পর্যায়ে বর্তমানে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১৩০-১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চার-পাঁচ দিন আগেও চিনির দাম ১২৫-১৩০ টাকা ছিল। সরকার প্রতি কেজি চিনিতে কমবেশি ১১ টাকা শুল্ক-কর কমিয়েছে। তাতে এখন চিনির দাম কমে প্রতি কেজি ১১৫-১২০ টাকা বা তারও কম হওয়ার কথা ছিল। পাইকারি বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, দাম বাড়ার মূল কারণ বাজারে চিনির সরবরাহ কম। বেশ কিছুদিন ধরেই এ অবস্থা চলছে। চিনির জন্য উৎপাদকদের কাছে তারা ক্রয়াদেশ দিলে সেই চিনি আসতে সময় লাগছে আট-দশ দিন। আর মিল গেটে আগে কেনা চিনির জন্য বেশি দাম দিতে হয়েছে। ফলে তাঁদের এখন বাড়তি দামে তা বিক্রি করতে হচ্ছে। বিষয়টিকে শুধুই অজুহাত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অবশ্য সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, গত রোববার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খুচরায় প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছে ১২৮-১৩৫ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে তা ছিল ১২৫-১৩৫ টাকা; এক মাস আগেও প্রায় একই দাম ছিল। চিনি উৎপাদকেরা অনেক দিন ধরে বলছিলেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির মূল্যবৃদ্ধি ও দেশে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্থানীয় বাজারে চিনির দাম বেড়েছে। চিনি আমদানিতে উচ্চ হারে নানা ধরনের শুল্ক-কর আরোপ ছিল। ফলে দেশের বাজারে চিনির দাম প্রতিবেশী দেশের চেয়ে অনেক বেশি।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৮ অক্টোবর পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনির ওপর বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩০ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করে এনবিআর। এরপর পরিশোধিত চিনির সরবরাহ আরও বাড়াতে ১৭ অক্টোবর পরিশোধিত চিনির ওপর বিদ্যমান আমদানি শুল্কে ছাড় দেয় সংস্থাটি। সরকারের প্রত্যাশা ছিল, এতে চিনির মূল্য সহনশীল পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, শুল্ক কমানোর পরে গত ১২ দিনে দেশে কোনো চিনি আমদানি হয়নি। ফলে হ্রাসকৃত শুল্কে নতুন চিনি না আসা পর্যন্ত দাম কমার সম্ভাবনা কম বলে জানান বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কম শুল্কের চিনি বাজারে কবে আসবে, তা জানাননি উৎপাদকেরা। আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে (তিন মাসে) দেশে অপরিশোধিত চিনি এসেছে মোট ২ লাখ ৩৯ হাজার টন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে দেশে ৩ লাখ ৯৩ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছিল। কিন্তু এসব দাবিকে মোটেই যৌক্তিক মনে করা হচ্ছে না।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিক্রি হওয়া চিনির একটি বড় অংশ আসে প্রতিবেশী ভারত থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এ চোরাচালানে যুক্ত ছিলেন। ওই সরকারের পতনের পর কিছুদিন চোরাচালান বন্ধ ছিল। চোরাচালানের কারণে দেশের চিনিশিল্প অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। এ কারণে চিনি আমদানি কমিয়ে দিয়েছিল দেশের পরিশোধন কারখানাগুলো। এখন তারা আমদানি না বাড়ানোয় বাজারে কিছুটা সরবরাহসংকট তৈরি হয়েছে। যদিও এখন অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা এ চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে বলে জানা যায়।

বর্তমানে অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে প্রতি টনে তিন হাজার টাকা শুল্ক দিতে হয়। পরিশোধিত চিনি আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্কের হার অপরিশোধিত চিনির ওপর থাকা শুল্কের দ্বিগুণ রাখা হয়েছিল। এর বাইরে উভয় ধরনের চিনি আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট, ১৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, ৫ শতাংশ অগ্রিম কর এবং ক্ষেত্রবিশেষে ২-৫ শতাংশ অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হয়। গত পাঁচ বছরের গড় আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিবছর গড়ে ১৯ দশমিক ৬৯ লাখ টন করে চিনি আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ দশমিক ৪৩ লাখ টন অপরিশোধিত চিনি এবং ১ লাখ ২৬ টন পরিশোধিত চিনি; অর্থাৎ প্রতিবছর যত চিনি আমদানি হয়, তার সিংহভাগই অপরিশোধিত চিনি, যা দেশে আনার পর পরিশোধন করে বাজারজাত করা হয়।

মূলত, বেসরকারি খাতের কয়েকটি কোম্পানি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে এবং পরিশোধনের পর তা বাজারে সরবরাহ করে। ফলে চিনির বাজার মূলত গুটিকয় কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। এরাই একতরফাভাবে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ইচ্ছা ও মর্জিমাফিক দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নানাবিধ ছলছুতার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। ফলে দেশের চিনির বাজারে নৈরাজ্য কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না। চিনি আমদানিতে শুল্ক-কর কমিয়ে দিয়ে কোন ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। মূলত, চিনির বাজারের সিন্ডিকেট এতোই শক্তিশালী যে তা ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না।

এমতাবস্থায় নিত্য প্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম যৌক্তিক পর্যায়ে না রাখা গেলে তা জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য ও খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। অন্যথায় আগামী দিনে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ